Saturday, May 16, 2020

চর্বিতচর্বণ ভুলে চলে যান তিনচুলে

প্রতিবার ডুয়ার্স থেকে বেড়িয়ে ফেরার সময় ভাবি এবারের সময়টাই সবচেয়ে ভাল কাটল, কিন্তু প্রতিবারই আমি ভুল প্রমাণিত হই আর নতুন কিছু নিয়ে ফিরি। ডুয়ার্সকে জানা আমার ফুরাবে না। অফুরান হয়ে থাকুক উত্তরবঙ্গের এই পার্বত্য অঞ্চলগুলো আর আমার এই ছোট সফরগুলো, যারা আমায় তাড়িয়ে বেড়ায় পাকদন্ডীর প্যাঁচালো পথে এবং পাহাড়ি জীবনের সরল অভিজ্ঞতায়।

এবারের পথ বাঁধা ছিল মূলত এক








টি ছোট পাহাড়ি গ্রামে, দার্জিলিং জেলার তিনচুলে আর ছোটা মাঙ্গওয়ায় প্রথাগত পথ ছেড়ে দেওয়াতেই আমাদের যত আনন্দ, তাই এবারেও শিলিগুড়ি থেকে রওনা হয়ে কালিম্পং-এর পথ না ধরে চললাম লামাহাট্টার পথে। সে পথ বেশ খাড়াই, কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকখানি উচ্চতায় উঠে গেলাম পাক খেয়ে খেয়ে, ভয়, রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার এই অভিজ্ঞতা যেকোন বিনোদন পার্কের রাইড চড়ার উল্লাসকে হার মানায়। এই পথের সৌন্দর্য বদলে যায় বারবার- কখনো উদাত্ত আকাশের নীচে বিস্তৃত চা বাগানের সবুজ গালিচা, কখনো আবার আলোছায়া ঘেরা যত আদিম মহাদ্রুম আমাদের পাহাড়ি পথের সঙ্গী হচ্ছে। জানিনা এমন নির্জন, স্বল্প পরিচিত অপরূপ পথ কবে আবার ডাক পাঠাবে আমাদের! মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা-মাখা পথের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌঁছলাম এবারের প্রথম গন্তব্যস্থল তিনচুলে-তে। উঠলাম গুরুঙ্গ গেস্ট-হাউসে। জিনিসপত্র গাড়ি থেকে নামিয়েই একছুটে বারান্দায়, হাত বাড়িয়ে নাকি মেঘ ধরা যায় এখান থেকে! বারান্দায় এসে দেখি, সাদা মেঘের আস্তরনে পাহাড় তখন অবগুণ্ঠিত। বৃষ্টি এল বোধহয় এক্ষুণি, মেঘেরা বারান্দায় এসে সে কথাই জানান দিয়ে গেল।

পাহাড়ের ধারেই এই গেস্ট হাউস, যারা আসেন তারা জানেন এই হোম-স্টের কথাওই যে ইচ্ছে গাঁও ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা লেখার সময় লিখেছিলাম এখানেও সেই আপ্তবাক্য মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট সুস্বাদু খাবার অঢেল পরিমাণে মিলবে কিন্তু হরেক কিসিমের যা ইচ্ছে খেতে চাইলে হোম-স্টে আপনার জন্য নয়। এখানে সকালে পুরি-সবজি বা ব্রেড-টোস্ট, ডিম, দুপুরে কাঁসার থালায় গরম ভাত, ঘি, আলুভাজা, মাছ ভাজা (পাহাড়ে এই প্রথম কাতলা মাছ খেলাম), ডাল, সবজি, জিভে জল আনা তেঁতুলের আচার আর পাঁপড় ভাজা রাতে রুটি, ডাল, সবজি, সুস্বাদু মাংস, পাঁপড় ভাজা, আচার সন্ধে বেলা মোমো, পকৌড়া, চা, সবই অরগ্যানিক (জৈব প্রক্রিয়ায় নির্মিত) এর থেকে বেশি কিছু কি চাওয়ার থাকে?

চাওয়ার থাকে যা, তা হল প্রকৃতিকে আরো বেশি করে পাওয়ার তাগিদ, তাই আবার খুঁজে ফেরা পরশমণি। পরের দিন গাড়ি করে গেলাম তাকদা অর্কিড বাগানে, দূরবীন দারা, বিখ্যাত রঙ্গলি রঙ্গলিয়ত চা বাগানে আর তিস্তা ভিউ-পয়েন্টে, এক এক করে দেখলাম সবকত রকমের পাখি (ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার, গ্রিন-ব্যাকড টিট, ওয়েজ টেল্ড গ্রিন পিজিয়ন, হিমালয়ান ও ব্ল্যাক বুলবুল, এসিয়ান কোয়েল, স্পটেড ডাভ ইত্যাদির দেখা পেলাম), অর্কিড দেখতে পেলাম যা আগে দেখিনি। বিখ্যাত রঙ্গলি রঙ্গলিয়ত চা বাগান রাস্তার দুধারে ছড়িয়ে আছে সবুজ ঢেউয়ের মত মাথার কাঁটার মত তিস্তার সর্পিল বাঁকগুলো উঁচু থেকে দেখে যতটা রোমাঞ্চিত হতে হয়, তার থেকে বেশি মনোবেদনা হয় কাছ থেকে তার অমন বন্দিনী দশা দেখে। এই তিস্তাকে চেনা যায় না, চঞ্চল, উদ্দাম তিস্তাকে বাঁধা হয়েছে নিষ্ঠুর সভ্যজগতের স্বার্থে। পুরনো নদীটি কোথায় গেল হারিয়ে?

অনেক বারই এমন অভিজ্ঞতা সবার হয় যে, জনপ্রিয় ভিউ-পয়েন্টগুলোর মধ্যে বেশির ভাগ জায়গাগুলোই হয় মামুলি এবং ভিড়-ঠাসা। কিন্তু এখানে নিরিবিলি প্রত্যেকটি জায়গার প্রেমে আপনি পড়বেনই আর মনে হবে আরো কিচ্ছুক্ষণ না হয় দেখা যেত পাহাড়ি উপত্যকা, রোদমাখা পাহাড়ের কোলে ছায়া-ছবি, বৃষ্টির পরে রোদ ওঠা নরম আকাশে ওই পাহাড়ের ওপরটাতেই রামধনুর রঙ চোখে নিয়ে ফিরে এলাম গেস্ট হাউসেআর সেখানেও তো অপেক্ষা করছে দলবাঁধা মেঘেরা, সবুজ-হলুদ রঙে মাখামাখি রূপকথার পাখিরা(বারান্দা থেকে একটু দূরের একটা উঁচু গাছেই তাদের যত বৈঠক, জানতে পারলাম ওরা হল গ্রেট বারবেট) সন্ধেগুলো কাটল গান, নাচ, আবৃত্তি পাঠে, গেস্ট-হাউসের রাজেন্দর ঢুকে পড়ে গিটার হাতে আমাদের দলে, রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে নেপালি গানে সে আমাদের ভাসিয়ে দেয়। আজকের রাতটাই তি্নচুলেতে, পরের দিন আবার অজানা পথে।

 


ডাক


পাহাড়িপথে একটা গন্ধ থাকে হাওয়ায় হাওয়ায়

পথের ধারে পড়ে থাকা পাইন, চির গাছের পাতায়

নিঃশব্দ ডাক থাকে, যে ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় থাকে না কারো

ফুরসত থাকে না আর স্থিতু মনে রুকস্যাক গোছাবার...

আঁধার নামে সর্পিল পথে, বিন্দু বিন্দু আলো আলেয়ার মত

কাছে আসে, দূরে যায়, সম্মোহিত করে জাদুকর যেন, আরো

নিকষ কালো রাতে, যখন শয়ে শয়ে জোনাকি প্রস্তুত থাকে

পথের বাঁকে, তখন মনের কানাচ উপচে ওঠে মায়ায়

ভালোবাসা-তাঁবুতে নেমে আসে স্বাতী, অরুন্ধতীরা, পক্ষীরাজ করে

ভেসে আসে ওরা জোনাক-পথে, কালপুরুষের বাকি সবাইকে ছেড়ে-

আমিও ছেড়ে যাই তখন আমার আমি-কে, বেপথু হই আধো-জাগরণে

জাতিস্মরের মতো দুটি সত্তার টানাপোড়েনে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি পাহাড়কে

 

 

সমর্পিতা ঘটক